কর্ণফুলী পানি বিদ্যুৎ কেন্দ্র দেশের একমাত্র জল বিদ্যুতের নির্ভরতা
পাহাড়ের বুক চিরে বয়ে চলা কর্ণফুলী নদী। তার বুকে বাঁধ বেঁধে তৈরি করা বিশাল কাপ্তাই লেক, শান্ত, অথচ গভীর। এই লেকের নীরব জলরাশির নিচেই লুকিয়ে আছে বাংলাদেশের একমাত্র জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের গল্প। রাঙামাটির কাপ্তাইয়ে অবস্থিত কর্ণফুলী পানি বিদ্যুৎ কেন্দ্র আজও দেশের বিদ্যুৎ খাতের একটি ব্যতিক্রমী ও ঐতিহাসিক স্থাপনা, যেখানে পানি ঘুরিয়ে দেয় আলোর চাকা।সরেজমিনে কাপ্তাই বাঁধ এলাকায় দেখা যায়, পাহাড়ঘেরা বিস্তীর্ণ জলাধার। বাঁধের ওপর দিয়ে বইয়ে যায় বাতাস আর নিচে অবিরাম কাজ করে যায় টারবাইন ইউনিটগুলো। বাইরে থেকে শান্ত মনে হলেও ভেতরে ভেতরে চলছে বিদ্যুৎ উৎপাদনের এক অবিরাম সংগ্রাম, পানির সঙ্গে সময়ের।১৯৬২ সালে কাপ্তাই বাঁধ নির্মাণের মধ্য দিয়ে কর্ণফুলী পানি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের যাত্রা শুরু। তৎকালীন পাকিস্তান সরকার শিল্পায়নের জ্বালানি চাহিদা মেটাতে কর্ণফুলী নদীকে বেছে নেয়। স্বাধীনতার পর বহু বিদ্যুৎকেন্দ্র যুক্ত হলেও জলবিদ্যুৎ খাতে আর কোনো বড় প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে আজও কর্ণফুলী পানি বিদ্যুৎ কেন্দ্রই দেশের একমাত্র বড় জলবিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র।বর্তমানে এই কেন্দ্রের স্থাপিত উৎপাদন ক্ষমতা প্রায় ২৩০ থেকে ২৪২ মেগাওয়াট। তবে এই সক্ষমতা সব সময় কাজে লাগানো যায় না। কারণ এখানে বিদ্যুৎ উৎপাদনের একমাত্র চালিকাশক্তি পানি।বিদ্যুৎ কেন্দ্রের পুরো এলাকা ঘুরে দেখা যায়, উৎপাদনের প্রতিটি সিদ্ধান্ত নির্ভর করে কাপ্তাই লেকের পানির উচ্চতার ওপর। বর্ষা মৌসুমে পাহাড়ি ঢল আর বৃষ্টির পানিতে লেক ভরে উঠলে বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রায় সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে, কখনো কখনো ২১৮ মেগাওয়াট পর্যন্ত। তখন জাতীয় গ্রিডে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখে এই কেন্দ্র। কিন্তু শুষ্ক মৌসুম এলেই চিত্র বদলে যায়। লেকের পানির স্তর নেমে গেলে উৎপাদন কমে আসে ৪০ থেকে ৫০ মেগাওয়াটে। কোনো কোনো সময় প্রয়োজনের তুলনায় তা নিতান্তই অপ্রতুল হয়ে পড়ে।কেন্দ্রের প্রকৌশলী হাসান শরিফ জনকণ্ঠকে বলেন, ‘এখানে বিদ্যুৎ মানেই পানি। পানি কমলে আমরা চাইলেও বেশি উৎপাদন করতে পারি না। তাই প্রতিটি ইউনিট চালানোর আগে পানির হিসাব কষে সিদ্ধান্ত নিতে হয়।’তিনি আরও জানান, কর্ণফুলী পানি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রযুক্তি জটিল নয়, কিন্তু কার্যকর। কাপ্তাই লেকে জমা পানি নিয়ন্ত্রিতভাবে বাঁধের গেট দিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়। উচ্চতা থেকে নামা পানি টারবাইনে আঘাত করে ঘূর্ণন সৃষ্টি করে। সেই ঘূর্ণন থেকেই জেনারেটরের মাধ্যমে উৎপন্ন হয় বিদ্যুৎ। পানি যত বেশি ও প্রবাহ যত শক্তিশালী, উৎপাদন তত বেশি। এই প্রক্রিয়ায় কোনো জ্বালানি পোড়ানো হয় না, নেই ধোঁয়া বা কার্বন নিঃসরণ। এখানেই জলবিদ্যুতের পরিবেশবান্ধব দিকটি সবচেয়ে স্পষ্ট।কাপ্তাই বাঁধের ফলে সৃষ্ট কাপ্তাই লেক শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনের উৎস নয়। এটি দেশের সবচেয়ে বড় কৃত্রিম জলাধার, যার সঙ্গে জড়িয়ে আছে পাহাড়ি জনপদের জীবন, মৎস্যসম্পদ, নৌযোগাযোগ ও পর্যটন। তাই পানির স্তর নিয়ন্ত্রণ শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রশ্ন নয়, সামাজিক ও পরিবেশগত ভারসাম্যের বিষয়ও।
কর্তৃপক্ষ জানায়, অতিবৃষ্টি বা পাহাড়ি ঢলের সময় যখন পানির স্তর বিপৎসীমার কাছাকাছি চলে আসে, তখন বাধ্য হয়ে বাঁধের জলকপাট খুলে অতিরিক্ত পানি ছেড়ে দিতে হয়। এতে একদিকে বাঁধ সুরক্ষিত থাকে, অন্যদিকে নি¤œাঞ্চলের মানুষ আকস্মিক বিপদের মুখে পড়া থেকে রক্ষা পায়কর্ণফুলী পানি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের আরও এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, ‘আমাদের উৎপাদন পরিমাণ জাতীয় চাহিদার তুলনায় কম হলেও এই বিদ্যুৎ সবচেয়ে সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব। আধুনিকায়ন ও পুরনো ইউনিট সংস্কার করা গেলে এখান থেকে আরও দক্ষ উৎপাদন সম্ভব।’জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, কর্ণফুলী কেন্দ্র প্রমাণ করে দিয়েছে, বাংলাদেশেও জলবিদ্যুতের সম্ভাবনা ছিল এবং আছে। জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ থাকলেও সঠিক পরিকল্পনা ও প্রযুক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে পাহাড়ি নদীগুলোতে ছোট ও মাঝারি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প গড়ে তোলা যেতে পারে।যখন দেশের বিদ্যুৎ খাত গ্যাস, কয়লা ও আমদানিনির্ভর জ্বালানির ওপর দাঁড়িয়ে, তখন কর্ণফুলী পানি বিদ্যুৎ কেন্দ্র যেন এক নীরব ব্যতিক্রম। পাহাড়ের জল আর প্রকৃতির শক্তিকে কাজে লাগিয়ে যে বিদ্যুৎ উৎপন্ন হয়, তা শুধু আলো জ্বালায় না, এটি দেখায় পরিবেশবান্ধব ভবিষ্যতের একটি সম্ভাব্য পথ। কাপ্তাইয়ের নীল জলরাশির দিকে তাকিয়ে দাঁড়ালে মনে হয়, এই পানির সঙ্গে মিশে আছে দেশের একমাত্র জলবিদ্যুতের আশা, নীরব, কিন্তু দৃঢ়।।
🎁 Your Special Offer is Loading...
Please wait a moment. You'll be redirected automatically after the countdown.
⏳ Stay here — your offer will open in a new page.
✅ Redirect happens only once per session.

Comments
Post a Comment